![]() |
| সংবাদ সম্মেলনে মুশফিকুর রহিম |
নিজেকে ‘বোরিং পারসন’ মনে করেন মুশফিক: ২০ বছরের ক্রিকেটযাত্রা, ত্যাগ আর সাফল্যের গল্প
রংচটা ক্যাপ, দুই দশকের স্মৃতিবহুল পথচলা আর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা—মুশফিকুর রহিমের প্রায় বিশ মিনিটের সংবাদ সম্মেলন যেন তুলে ধরল এক ক্রিকেটারের জীবনের সম্পূর্ণ যাত্রাপথ। বাংলাদেশের প্রথম ক্রিকেটার হিসেবে টেস্টের সেঞ্চুরি পূর্ণ করার উপলক্ষে চারপাশে চলছে তাঁর প্রশংসার ধারাবাহিকতা।
সাবেক-বর্তমান সতীর্থ থেকে শুরু করে কোচ, ভক্ত—সবাই মুগ্ধ তাঁর পরিশ্রম, অধ্যবসায় আর অনুশাসনে। শততম টেস্টের ম্যাচে আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে সেঞ্চুরি করে মুশফিক নিজের মাইলফলকটিকে আরও রঙিন করে তুলেছেন।
‘আমি একজন বোরিং পারসন’—মুশফিকের অকপট স্বীকারোক্তি
সংবাদ সম্মেলনে যখন তাঁকে নিজের আয়নায় নিজেকে কেমন মনে হয়—এ প্রশ্ন করা হলো, তখন প্রথম বাক্যেই হাসির রোল পড়ে যায় ঘরজুড়ে। মুশফিক বলেন,
“সত্যি কথা যদি বলি, আমি একজন বোরিং পারসন।”
কেন এমন মনে করেন? তাঁর ব্যাখ্যা,
“প্রতিদিন একই কাজ, একই অনুশীলন… ২০ বছর ধরে করি। যদি দলের দরকার হয়, আরও ৪০ বছর করব। স্কোর আমার হাতে নেই, কিন্তু চেষ্টা, প্রক্রিয়া আর সততা আমার হাতেই। সেটাই আমার জীবনের মোটো—শুধু ক্রিকেটে নয়, জীবনের সব জায়গায়।”
২০০৫ থেকে ২০২৫: প্রক্রিয়া একই, উত্তেজনাও একই
২০০৫ সালে লর্ডসে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে টেস্ট অভিষেক। তারপর থেকে ১০০ টেস্ট, ৩টি ডাবল সেঞ্চুরি, ১২টি সেঞ্চুরি এবং ছয় হাজারের বেশি রান।
তবুও মুশফিকের কাছে প্রতিটা টেস্ট মানে প্রথম ম্যাচ খেলার উত্তেজনা।
তিনি বলেন,
“১০০ টেস্ট খেলেছি, কিন্তু মনে হচ্ছিল প্রথম ম্যাচ খেলছি। প্রতিটা ম্যাচে প্রথমবারের মতোই প্রস্তুতি নেওয়ার চেষ্টা করি।”
ক্রিকেটের জন্য সবচেয়ে বড় ত্যাগ—স্ত্রী জান্নাতুল কিফায়াত
ব্যক্তিজীবনে পা রাখেন ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে। ক্রিকেট আর সংসার সামলানোর কঠিন সময়গুলোতে পাশে ছিলেন তাঁর স্ত্রী।
মুশফিক বলেন,
“সবচেয়ে বড় ত্যাগ আমার স্ত্রী করেছে। আমি হয়তো অন্যদের চেয়ে বেশি অনুশীলন করি। এটি সম্ভব হতো না যদি ঘরে এমন পরিবেশ না থাকত।”
জয়েন্ট ফ্যামিলির দায়িত্ব সামলানো থেকে জরুরি বিষয়গুলো একাই ম্যানেজ করা—সবই করেছেন কিফায়াত। সন্তানদের রাত জেগে সামলানোতেও স্বামীর উপর কখনো বাড়তি চাপ পড়তে দেননি।
মুশফিকের ভাষায়,
“আমার কখনো নির্ঘুম রাত কাটেনি। সে পুরো রাত জাগে বাচ্চাদের সঙ্গে, যাতে আমি পরদিন অনুশীলনে ফোকাস রাখতে পারি। তাই তার প্রতি আমি সবসময় কৃতজ্ঞ।”
বিয়ের পর ক্যারিয়ারে বিশাল পরিবর্তন
বিয়ের আগে ৭৫ ইনিংসে ২১৫২ রান ও মাত্র ৩টি সেঞ্চুরি।
বিয়ের পর ১০৮ ইনিংসে ৪১০৫ রান, ১০টি সেঞ্চুরি—গড় বেড়ে ৪১.৮৮।
মুশফিক নিজেই স্বীকার করেছেন,
“২০১৪ সালের পর আমার ক্রিকেটে যে পরিবর্তন এসেছে, সেখানে তার (স্ত্রীর) ভূমিকা বিশাল। তাই তাকে ধন্যবাদ জানাই।”
শেষ কথা
বারবার একই কাজ করতে করতে একসময় অনেকেই বিরক্ত হয়ে যায়। কিন্তু সেই ‘বোরিং’ প্রক্রিয়াই যখন কাউকে করে তোলে দেশের ইতিহাসে প্রথম ১০০ টেস্ট খেলোয়াড়—তখন বোঝা যায়, সাফল্যের আসল রহস্য কোথায়।
মুশফিকুর রহিমের গল্পটা তাই শুধু ক্রিকেটার নয়—একজন অধ্যবসায়ী মানুষ, দায়িত্বশীল স্বামী ও নিবেদিত পেশাদারের গল্পও বটে।


